সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান
যারা চির স্মরণীয় হয়ে থাকবেন
আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ
========
বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় উত্তাল আবহাওয়া বিশ্বের অনেক মানুষকে শুধু প্রভাবিত করেনি, দারুণভাবে তাদের মনকে আন্দোলিত করে। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের শরণার্থী, মুক্তিযোদ্ধা, সাধারণ মানুষের দুর্দশা, পাকিস্তানি মিলিটারি বাহিনীর অমানবিক, নিষ্ঠুর আচরণ বিশ্বের সংবাদপত্রে ও টেলিভিশনে যেভাবে স্থান করে নিয়েছিল, সাম্প্রতিক কোনো ঘটনা এমন প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়নি। বাংলাদেশের শরণার্থীদের দুর্দশা দেখার পর ইউরোপের সাধারণ এক তরুণের তাদের সাহায্যার্থে বিমান ছিনতাইয়ের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের ঘটনাও অসাধারণ তাৎপর্যের অধিকারী। আমেরিকায় বাংলাদেশের বন্ধুরা আমেরিকার নীতির বিরুদ্ধে অভিনব প্রতিবাদের জন্য এমআইটির খ্যাতিমান ও প্রভাবশালী ভাষাবিজ্ঞানের অধ্যাপক নোয়াম চমস্কিকে দিয়ে অনশনের দিক চিন্তা করলেও শেষ পর্যন্ত তার বিপদের কথা স্মরণ করে আর সামনে অগ্রসর হননি। বিবেকসম্পন্ন সাধারণ মানুষ, বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় ছাড়াও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে সঙ্গীতশিল্পীরাও অগ্রসর হয়েছিলেন। তাদের অবদানও কম উল্লেখযোগ্য নয়। এ ক্ষেত্রে তিনজন বিখ্যাত শিল্পীর নামোল্লেখ করা যায়। এরা হলেন আমেরিকার সবচেয়ে খ্যাতিমান নারী ফোকশিল্পী জোন বায়াজ, ইংল্যান্ডের বিটলসদের অন্যতম জর্জ হ্যারিসন ও প্রথিতযশা সরোদবাদক ওস্তাদ আলী আকবর খান। এ তিনজনই প্রত্যক্ষভাবে গান ও কনসার্টের মাধ্যমে বাংলাদেশকে সাহায্যের জন্য অগ্রসর হয়েছিলেন এবং অ্যালবাম বের করেছিলেন।
জোন বায়াজ ছিলেন আমেরিকান প্রতিবাদী শিল্পী। মানবতার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে তিনি ছিলেন প্রথম সারির সঙ্গীতশিল্পী। আমেরিকায় বব ডিলানও তার গানে সমাজের অন্যায়ের দিকটি প্রকাশে ছিলেন অত্যন্ত সাহসী ফোকশিল্পী। একসময় জোন বায়াজ ঘোষণা দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করেননি যে, তিনি ভিয়েতনাম যুদ্ধ সমর্থন করেন না এবং তিনি কোনো আয়কর দেবেন না ভিয়েতনাম যুদ্ধে ব্যবহারের জন্য। জোন বায়াজ ছিলেন আকর্ষণীয় মুখাবয়বের অধিকারী, মাথার কালো চুল তার মুখের দীপ্তি আরো বাড়িয়ে দিত। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আগেই প্রকাশিত হয়েছিল তার অটোবায়োগ্রাফি। তার গায়কী ভঙ্গির অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য ছিল, যা অন্য কোনো আমেরিকান শিল্পীর মধ্যে দেখা যায়নি। তিনি গান গাওয়ার সময় উচ্চনাদে এমনভাবে পৌঁছাতেন যা গানের শব্দের ব্যঞ্জনা অনেকাংশ বাড়িয়ে দিত। তার যেসব অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছিল তার মধ্যে প্রথম দিকের 'জোন' শিরোনামে অ্যালবামটি শ্রোতানন্দিত হয়। এ অ্যালবামে 'বি নট টু হার্ড, লাইফ ইজ শর্ট' এবং পরবর্তীকালে 'ফেয়ারওয়েল অ্যাঞ্জেলিনা'-এ গান দুটি একসময় অনেকের মুখে মুখে শোনা যেত। পরে তিনি বব ডিলানের গানে দুটো অ্যালবাম একসঙ্গে বের করেন। এরপরই প্রকাশিত হয় সম্ভবত তার শেষ অ্যালবাম, যেখানে বাংলাদেশের গানটি অন্তর্ভুক্ত হয়। তার সব অ্যালবামই প্রকাশ করত ভ্যানগার্ড রেকর্ড কোম্পানি। পরে ভ্যানগার্ড তাকে ফোকসং ও রক-এর মিশ্রণ দিতে বললে তিনি তাদের প্রস্তাবে অসম্মত হয়ে সেখান থেকে রেকর্ড প্রকাশ বন্ধ করে দেন।
জোন বায়াজের বাংলাদেশ সম্পর্কিত গানের নেপথ্য একটা ইতিহাস আছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রতিবাদী শিল্পী দারুণভাবে আলোড়িত হন। প্রথম পর্যায়ে তিনি বাংলাদেশের শরণার্থীদের অর্থ সাহায্যের জন্য ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ট্যানফোর্ড ও বার্কলে ক্যাম্পাসে গান গাইতে শুরু করেন। এরপর নিজেই বাংলাদেশের ওপর গান রচনা করে প্রথমে ৪৫ আরপিএম রেকর্ড প্রকাশ করেন। এ অ্যালবাম বাজারজাত হওয়ার পর আমেরিকা ও কানাডার বিভিন্ন রেডিও স্টেশন দিনে অসংখ্যবার বাজাতে থাকে। গানটি প্রচারের পর সাধারণ শ্রোতার ওপর একটা প্রভাব বিস্তার করে। পরে জোন বায়াজের বড় অ্যালবাম বের হলে গানটি এখানে অন্তর্ভুক্ত হয়। এই নতুন অ্যালবামের বৈশিষ্ট্য হলো মানবতাবাদী আমেরিকান শিশু চিকিৎসক ডা. স্পোকের মিছিলের ছবি। অ্যালবামটির নাম ছিল 'কাম ফ্রম দি শ্যাডোজ'। জোন বায়াজের গানে তৎকালীন ইকবাল হলে (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) ঘুমন্ত ছাত্রদের ওপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সদস্যদের গুলিবর্ষণ, বাঙালি শরণার্থীদের দুর্দশা ও অন্যান্য ঘটনা উপস্থাপন করা হয়।
১৯৭১ সালে স্বরচিত গানের কথায় তিনি নিজেই সুরারোপ করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় প্রথম লিখিত ও প্রচারিত জোন বায়াজের এ গানের মূল্য অপরিসীম, যা সারা বিশ্বের মানুষের কাছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বাণী পেঁৗছিয়ে দিয়েছিল_ একটি দেশের মুক্তির জন্য মানুষের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম।
জোন বায়াজের পর বাংলাদেশ কনসার্টের জন্য যার নাম ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত তিনি সাবেক বিটলস দলের জর্জ হ্যারিসন। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন অন্য এক বিটলস সদস্য রিঙ্গো স্টার। বিটলস দল অনেক আগেই ভেঙে গিয়েছিল, দলের প্রধান জন লেলন তখন মৃত আর অন্যজনের সঙ্গে হ্যারিসনের কোনো সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু এ কনসার্টে জর্জ হ্যারিসন প্রধান হলেও এর নেপথ্যে ছিলেন খ্যাতিমান সেতারবাদক রবিশঙ্কর। বাংলাদেশের শরণার্থী, মুক্তিযোদ্ধাদের সংগ্রাম ও জনসাধারণের দুর্দশা তাকে বিশেষভাবে স্পর্শ করেছিল বাঙালি ও তার ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সঙ্গে সংশ্রবের কারণে। প-িত রবিশঙ্কর ইংল্যান্ডে প্রথম পরিচিত হন বিখ্যাত ভায়োলিন বাদক য়েহুদি মেনুহিনের সঙ্গে। পরে তিনিই তাকে বিটলসদের সঙ্গে পরিচিত করিয়ে দেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় একা রবিশঙ্করের পক্ষে কনসার্ট করা সম্ভব নয় বলে তিনি জর্জ হ্যারিসন ও রিঙ্গো স্টারের সহযোগিতা কামনা করেন। হ্যারিসনরা তার প্রস্তাবে রাজি হয়ে কনসার্টের ব্যাপারে সম্মতি প্রকাশ করেন। কনসার্ট অনুষ্ঠিত হয় আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে ১৯৭১ সালের ১ আগস্টে। কনসার্টের নাম দেয়া হয় 'দি কনসার্ট ফর বাংলাদেশ'। এ কনসার্টে অংশগ্রহণ করেন রবিশঙ্কর, আলী আকবর খান, আল্লারাখা খান, কমলা চক্রবর্তী, জর্জ হ্যারিসন, রিঙ্গো স্টার, বিলি প্রেস্টন, লিওন রাসেল ও বব ডিলান। এখানে উল্লেখ্য যে, আমেরিকার খ্যাতিমান ফোকসঙ্গীত শিল্পী ও গীতিকার কবি বব ডিলান কোনো সময় অন্যের কনসার্টে অংশগ্রহণ করতেন না, শুধু বাংলাদেশের কনসার্টেই অংশগ্রহণ করেছিলেন।
কনসার্টের পর প্রকাশিত সুভেনিরে বাংলাদেশ সম্পর্কে সংক্ষেপে মন্তব্য করেন ড. আলেকজান্ডার লিপসকি ও সুজেনা মার্টিন এবং রবিশঙ্কর। রবিশঙ্কর মূল অনুষ্ঠানে সেতার ও সরোদ বাদ্যযন্ত্র বাজানোর আগেও সংক্ষেপে কনসার্ট অনুষ্ঠানের মূল কারণ ব্যাখ্যা করেছিলেন। এখানে উল্লেখ্য যে, রবিশঙ্কর ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর মেয়েকে বিয়ে করেন।
বাংলাদেশ কনসার্টে রবিশঙ্কর সেতার, আলী আকবর খান সরোদ, আল্লারাখা তবলা ও কমলা চক্রবর্তী তাম্বুরা বাজান। জর্জ হ্যারিসন তার বিখ্যাত গান ওয়া-ওয়া, মাই সুইট লর্ড, হিয়ার কামস দি সান, সামথিং ও নতুন গান বাংলাদেশ পরিবেশন করেন। বব ডিলানও তার বহুল পরিচিত হিট গান মিস্টার তাম্বুরিন ম্যান, বেস্নাইং ইন দ্য উইন্ড, জাস্ট লাইক এ ওম্যান ও অন্যান্য গান গেয়ে শোনান। এ কনসার্টের বৈশিষ্ট্য হলো এখানে স্টেরিও সিস্টেমে একদিকের স্পিকারে রবিশঙ্করের সেতার ও অন্য স্পিকারে আলী আকবর খানের সরোদ এবং একসঙ্গে দুটো স্পিকারে তবলা ও সরোদ শোনানোর ব্যবস্থা করা হয়। কনসার্ট রেকর্ডিং করার সময় ব্যবহৃত হয় ৪৪টি মাইক্রোফোন।
কনসার্ট অনুষ্ঠান পরবর্তী পর্যায়ে চলচ্চিত্রের আকারে বিভিন্ন সিনেমা হলে প্রদর্শিত হয়। বাংলাদেশ কনসার্টের তিনটি অ্যালবাম বিশেষ মোড়কে ক্রেতাদের কোনো কমিশন না দিয়েই মূল্য ধার্য করা হয় ১০ ডলার। চলচ্চিত্র ও তিনটি অ্যালবাম ছাড়াও স্বতন্ত্রভাবে কনসার্টের টেপ বাজারজাত করা হয়। কনসার্ট থেকে প্রাপ্য ডলার বাংলাদেশের রিফিউজি সন্তানদের কল্যাণে ব্যয় করার জন্য ভারতে পাঠানো হয়। ডলারের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৪৩ হাজার ৪১৮ ও ৫০ সেন্ট। এ কনসার্টে কোনো শিল্পী দক্ষিণা গ্রহণ করেননি।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালি হিসেবে ওস্তাদ আলী আকবর খানও নিশ্চুপ থাকতে পারেননি। তিনি বাংলাদেশ কনসার্টে অংশগ্রহণ ছাড়াও এককভাবে সরোদের একটি অ্যালবাম প্রকাশ করেন। অ্যালবামের নাম দিয়েছিলেন 'বাংলাদেশ'। তিনি বাংলাদেশ ধুনের সঙ্গে পুরনো আরো কটি ধুন নিয়ে এ অ্যালবাম বের করেছিলেন। তবে যন্ত্রসঙ্গীতের অ্যালবাম বলে এটা তেমন প্রচার সৌভাগ্য লাভ করেনি।
বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের পাশাপাশি শিল্পীরাও যে বিরাট অবদান রাখেন তার মূল্য ছিল অসীম। এ কারণে এ দেশের মানুষের কাছে জর্জ হ্যারিসন, রবিশঙ্কর, আলী আকবর খান ও জোন বায়াজ স্মৃতির মণিকোঠায় চিরদিন ভাস্বর হয়ে থাকবেন।( সংগৃহিত)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন