সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান
আমাদের বর্তমান তথ্য ও প্রযুক্তি শিক্ষা--গ্রামগঞ্জে প্রতিষ্ঠিত হাজারো মাদ্রাসার কর্মবিমুখ ধর্মীয়শিক্ষা ---
____________________________
পাকিস্তানের জামাতে ইসলামী এবং বাংলাদেশের জামাতে ইসলামী এবং অন্য ইসলামী দলগুলীর মধ্যে শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে স্ব-স্ব দলীয় নীতির ব্যাপক পার্থক্য বিদ্যমান।অন্যান্ন মুসলিম দেশ সমুহের মধ্যে শিক্ষা ব্যবস্থায় আরবী শিক্ষার জন্য বা আলেম হওয়ার জন্য আলাদা কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই। সব প্রতিষ্ঠান গুলির নাম মাদ্রাসা হলেও বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখা প্রশাখায় বিচরন আছে। সেখানে প্রচলিত সব বিষয় গুলী পাঠদান করা হয়। মাধ্যমিকের পর উচ্চশিক্ষায় ছাত্রদের পছন্দ অনুযায়ী বিষয় বাছাই করে উচ্চতর জ্ঞানার্জনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।পাকিস্তানের জামাতে ইসলামী ও তদ্রুপ শিক্ষা ব্যবস্থার পক্ষে। তাঁরা মনে করে আরবী এবং সাধারন শিক্ষার জন্য আলাদা আলাদা প্রতিষ্ঠান বাঞ্চনীয় নয়।
পাকিস্তানের জামায়াতের আমীর কাজী হুসেইন আহমেদ শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে যা বলেন, সেটি আবার আমাদের দেশের জামায়াত বা ইসলামী দলগুলি বলে না। হুসেইন আহমেদের মতে, মাদ্রাসা এবং স্কুল বলতে আলাদা কিছু থাকা উচিত নয়। সব শিক্ষাই এক হওয়া উচিত। তিনি মনে করেন, স্কুল পর্যন্ত সবারই ভাষা, অঙ্ক, বিজ্ঞান, ভূগোল, ইতিহাস ইত্যাদি সব বিষয়ই পড়বে এবং স্কুলের পরে কেউ ইচ্ছে করলে ধর্মীয় বিষয় নিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করবে।
কাজী হুসেইন আহম্মদ সাহেব যদি স্কুলকে মাদ্রাসায় পরিণত না করে স্কুলের শিক্ষাকে সাধারণ শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করেন এবং মাদ্রাসাগুলোকে স্কুলে রুপান্তরের প্রস্তাব দিতেন তবে তার প্রস্তাব পাকিস্তানের জনসাধারন এবং সরকার সমর্থন করতেন আমার বিশ্বাস।তবে প্রস্তাবটি যেহেতু নাড়াচাড়া শুরু হয়েছে -এক সময় এদিক সেদিক একটা ভাল সিদ্ধান্ত আসবে আশা করা যায়।
আমাদের দেশের ইসলামী দলগুলী যদি এইরুপ শিক্ষাব্যবস্থা প্রনয়নের দাবি জানাতেন তাহলে বিপুল সংখ্যক ছাত্র ছাত্রী দেশের বোঝা না হয়ে দেশের সম্পদে রপান্তরীত হতে পারত।এই ক্ষেত্রে বাংলা ইংরেজী যত নম্বরে পরিক্ষার ব্যবস্থা আছে তত নম্বরের আরবী পরিক্ষা প্রনয়ন করার দাবিও করতে পারেন।
আবার আলাদা ভাবে বর্তমানের মক্তবের পরিধি আরও বিস্তৃত করে মক্তব শিক্ষাকে প্রত্যেক মুসলিম ছেলে মেয়ের জন্য বাধ্যতামুলক করার দাবিও গ্রহন যোগ্য হতে পারে। প্রত্যেক সমাজ কেন্দ্রিক মসজিদ প্রতিষ্ঠা করত: সেই মসজিদের আওতায় মক্তব চালু করার দায়িত্ব সরকারি ভাবে করার সিদ্ধান্ত থাকতে পারে।উক্ত মসজিদের দুই জন ইমাম একজন মোয়াজ্জেম সরকারি প্রাইমারী স্কুলের মতই সরকারি বেতন ভাতায় নিয়োগ দিয়ে মক্তব এবং মসজিদকে সরকারি করন করার দাবিও অযোক্তিক হবেনা।
প্রত্যহ সকালে ছেলে মেয়েরা বর্তমানের নিয়ম অনুযায়ী মক্তবে আরবী শিক্ষার প্রাথমিক পাঠ গ্রহন করবে। নামাজ পড়ার নিয়ম কানুন মক্তবেই শিক্ষা গ্রহন করবে। প্রত্যহ এক অথবা দেড় ঘন্টা সকালে মক্তবে তালিম নিয়ে ৯/১০টায় বিদ্যালয়ে সাধারন শিক্ষা গ্রহন করবে। মাধ্যমিক পয্যন্ত সাধারন শিক্ষার পর উচ্চ শিক্ষা পছন্দ অনুযায়ী আরবী, বাংলা, ইংরেজী যাহাই পড়ুক না কেন ছাত্র/ছাত্রীদের স্বাধীন ভাবে বাছাই করার ব্যবস্থা রাখার দাবি ও আলেম সমাজের পক্ষ থেকে আসতে পারে।
আমাদের দেশে দুই শ্রেনীর মাদ্রাসা শিক্ষা চালু আছে,একটি সরকার নিয়ন্ত্রীত আ'লীয়া মাদ্রাসা অন্যটি সচরাচর আলেম সমাজ ও জনগনের অর্থে পরিচালনা কমিটি কতৃক নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত।
প্রথমোক্তটির ছাত্রছাত্রীরা সববিষয়ের উপর জ্ঞান অর্জন করার কারনে সরকারি বেসরকারি চাকুরিতে অংশ গ্রহন করার সুযোগ পেয়েছে।তাই তাঁদের পক্ষ থেকে সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা অনেকটা লাঘব হয়েছে বলে আমি মনে করি।
শেষোক্ত শ্রেনীর মাদ্রাসার বেশির ভাগ আবার ব্যাক্তি বিশেষ পরিচালিত। এখানে সরকার, জনগন কারো কোন নিয়ন্ত্রন নেই।উভয় শ্রেনীর মাদ্রাসা সমুহে বাংলা, ইংরেজী, অংক, বিজ্ঞানের সামান্য ছোঁয়াও নেই।এই শ্রেনীর মাদ্রাসাগুলির বিস্তৃতি আরব রাষ্ট্র সমুহে নেই- ভারতীয় উপমহাদেশেও তেমন ছিলনা।গত ২৫/৩০ বছরের মধ্যে ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটেছে শুধু বাংলাদেশে। এই সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে যে শিক্ষার্থীরা আরবী জ্ঞান অর্জন করে বের হয় পরবর্তিতে সে জ্ঞান ইহজগতে কাজে লাগানোর তেমন কোন ক্ষেত্র নেই। তাঁরা শুধুমাত্র ইমাম, মোয়াজ্জেম, তদ্রুপ মাদ্রাসায় শিক্ষকতা ছাড়া অন্য উপায় না থাকায় ব্যাক্তিগতভাবে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত করে-সেখানে নীজেরা নিয়ন্ত্রন করে।সেখানকার আয় দিয়ে --পরিবার পরিজন পরিচালনার ব্যবস্থা করেন। উদ্দেশ্য যতটানা ধর্মীয় শিক্ষার বিস্তৃতি--তাঁরচেয়ে ঢেরবেশী আর্থিক দুরাবস্থা নিরাময়।
আরবের কোন দেশে এই শ্রেনীর প্রধান প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি হয়নি--হয়েছে ভারতের দেওবন্দে। দেওবন্দ মাদ্রাসার পাঠ্যসুচি অনুকরনে এই সমস্ত মাদ্রাসার শিক্ষাকায্যক্রম পরিচালিত হয়। স্থানীয়ভাবে গরিবের জন্য বরাদ্ধকৃত চাল গমের সাহায্য নিলেও শিক্ষার উন্নতি অগ্রগতির কোন সাহায্য মাদ্রাসা গুলি গ্রহন করেনা। তবে একাডেমিক ভবন নির্মানে অনেক ক্ষেত্রে সরকারি সাহায্য গ্রহন করতে দেখা যায়।
বর্তমানের অবস্থা চলতে থাকলে আগামী দশ বছরের মধ্যে প্রত্যেক পরিবার পিছু একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হলেও আচার্য্য হওয়ার কিছুই থাকবেনা।এত বিপুল সংখ্যক আলেমের যেহেতু কোন কর্ম সংস্থান নেই তাঁরাতো আর বেকার থাকতে পারেনা। বর্তমানে তাঁদের মারমুখি অবস্থানের কারনটি কিন্তু সেখানেই নিহীত।
প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসার মালিক বা ব্যবস্থাপক গন যতনা ধর্মীয় কারনে সরকারের উদ্যোগের বিরুধীতা করেন তার চেয়েবেশী তাঁদের সাময়িক আর্থিক ও পারিবারিক বিপয্যয়ের সম্মুখ্যিন হওয়ার সমুহ সম্ভাবনার চিন্তা। তাঁদের সাময়িক আর্থিক অনটনের চিন্তার কারনে ব্যাপক সংখ্যক তাঁদেরই ছাত্র-বেকারত্বের জীবন অতিবাহিত করে বিভিন্ন অসামাজিকতায় সম্পৃত্ত হতে পারে বা হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে-- তাও তাঁদের মরুব্বিদের চিন্তা চেতনায় আসছেনা। যেহারে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে সেহারে মাদ্রাসা গুলীর ছাত্র সংখ্যা বাড়বেনা। বাংলাদেশের সব শিশুরাও যদি মাদ্রাসা গুলিতে লেখাপড়া করে তারপরও একসময়ে ছাত্র সংকট দেখা দিতে বাধ্য।
এই বিপুল সংখ্যক মানব সমাজকে একেবারে অকর্মন্য রেখে দেশ ও জনগনের বিপয্যয় ডেকে আনা ছাড়া আর কোন গত্যান্তর আছে বলে আমি মনে করিনা। এমনিতে বর্তমানে বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামে তিনের অধিক মাদ্রাসা স্থাপিত হয়ে আছে। যেখানে শতবছরের সরকারি ও বেসরকারি চেষ্টা, অক্লান্ত পরিশ্রমেও প্রতি গ্রামে একটি প্রাইমারি স্কুলের জনচাহিদা পুরন করা সম্ভব হয়নি-সেখানে ব্যাক্তি উদ্যোগে ২০/২৫ বছরের মধ্যে প্রতি গ্রামে তিনের অধিক মাদ্রাসা ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কারন চিন্তা করলেই ব্যপারটি সব মহলের নিকট আশা করি স্পষ্ট হবে।
আমি জানি অনেকের ধারনা হবে বা হতে পারে আমি আরবী শিক্ষার বিরুধীতা করছি বা আমি নাস্তিক, অধার্মিক ইত্যাদি। পারলে জবাই করে দেয়ারও কেহ কেহ সিদ্ধান্ত নিয়ে নিতে পারেন। তারপরেও বলব বিষয়টি গভীর ভাবে চিন্তা করে দেখার জন্য-সব মহলকে।
সরকার হয়ত এই সমস্ত ধর্মীয় ব্যপারে সিদ্ধান্ত নিতে গেলে গদি হারানোর সমুহ সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে। সরকার আলোচনা করতে চাইলেও প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসার কর্নধারদের তোপের মুখে পড়বে এবং ধর্ম বিরুধী সরকারের তকমা নিয়ে ক্ষমতাও ছাড়তে হবে।ঐ সমস্ত মাদ্রাসার ছাত্রদের বিষয়টি নিয়ে গভীর ভাবে চিন্তা করার দরকার আছে বলে আমি মনে করি। এখন হয়তোবা সংখ্যার আধিক্য ঘটে নাই বিধায় পরিবার পরিজন প্রতিপালন করা সহজ হচ্ছে, জনগনও সম্মান শ্রদ্ধা করছে। অদুর ভবিষ্যতে ঘরে ঘরে মাদ্রাসা এবং আলেম সৃষ্টি হয়ে গেলে কে কাকে পড়াবে আর সম্মান বা শ্রদ্ধাও করবে।
লক্ষনীয় বিষয়টি হচ্ছে আমাদের দেশের খান্দানী খোন্দকার পরিবার গুলী ইতিমধ্যে উল্লেখিত শ্রেনীর আলেম উলামাদের আধিক্যে পেশার লাভ হারিয়ে ছেড়ে অন্য পেশায় নিযুক্ত হয়ে গেছেন।একটি পরিবার ও অবশিষ্ট নেই বাপ-দাদার খোন্দকারি পেশায় জড়িত আছেন।
সরকার আমাদের সমুহ বিপদগ্রস্ত আলেম সমাজের প্রতি দৃষ্টি দিবেনা বা দিলেও ফললাভ করতে পারবেনা।এই বিপুল সংখ্যক আলেম উলামা সমাজকে জনসম্পৃত্ত করে দেশের সম্পদে রুপান্তরের জন্য প্রয়োজন সামাজিক উদ্যোগ বা সামাজিক সচেতনতা। দেশের প্রত্যেক সচেতন নাগরিক এখনি বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনা না করলে বেশী দিন সময় লাগবেনা --সামাজিক বিরাট অস্থিরতা সৃষ্টি হবে,এতে কোন সন্দেহ নেই। তাঁদের হাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা তুলে দিলেও কোন লাভ হবেনা। সকল শিক্ষাব্যবস্থা অনুরুপ করে দিলেও কোন ফললাভ হবেনা। কারন যেখানে জ্ঞান বিজ্ঞানের আলো নেই সেখানে দেশ পরিচালনা হবে কিভাবে? অর্থনীতির চাকাও ঘুরবে কিভাবে?
ইসলাম জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলো ঘরে ঘরে জ্বালাতে বারন করেনি। রাষ্ট্র পরিচালনায় আধুনিকতার সংস্পর্ষে যেতেও বারন করেনি। এইরুপ সামাজিক সমস্যা দেখা দিলে শীর্ষস্থানীয় আলেম সমাজের পরামর্শ গ্রহন করার কথা কোরানেই বলা আছে। সুতারাং দেশের বিশাল জন সমষ্টির বিষয়টি নিয়ে গভীর ভাবে চিন্তাভাবনা করা প্রত্যেক সুনাগরিকের দায়িত্ব এবং কর্তব্য। কিভাবে বা কোন পদ্ধতিতে বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে সম্পৃত্ত করে ধর্ম এবং জীবন দুটাই পরিচালনা করা যায় তাঁর উদ্যোগে প্রয়োজনে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা একান্ত জরুরী। সামাজিক আন্দোলন গড়ে উঠা ছাড়া কোন প্রতিষ্ঠিত সরকার ও চাইবেনা ঝুঁকিপুর্ণ কোন সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে।
সবমহলের শুভবুদ্ধির উদয় হোক
অশুভ শক্তির উত্থান রোধে প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকুক।
ধর্মকর্মে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনে সব মহল সচেতন হোক।
আল্লাহ সকল বাংলাদেশীর মঙ্গলময় জীবন দান করুক।
______________________________
জয়বাংলা জয়বঙ্গবন্ধু
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন