সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান
ইলেকট্রোনিক মিডিয়ার গনতন্ত্র, জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মানে প্রকৃত ভুমিকা পালন করার সময় এসেছে----
___________________________________
এমন একটি সময় ছিল যখন পত্রপত্রিকা, ইলেকট্রোনিক মিডিয়া বলতে- হাতে গোনা কয়েকটি পত্রিকা আর বাংলাদেশ টেলিভিশন।তাও আবার বাংলাদেশের সব জায়গায় পত্রিকাও পাওয়া যেতনা টিভিও দেখা যেতনা।তখনকার পরিবেশে গ্রামের মাতব্বরের সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করতে হত ব্যাক্তি রাজনীতির ধারনা।
আমি বলছি সামন্ততন্ত্রের পরের কথা।সামন্তপ্রথা উচ্ছেদ হয়েছে অনেক আগেই কিন্তু রেশ রয়ে গেছে সামাজিক অনোন্নতির-অনগ্রসরতার কারনে।এখন সমাজ অনেক এগিয়ে গেছে।পত্রিকার সংখ্য অনেক গুন বেড়েছে, ইলেকট্রোনিক মিডিয়াও আকাংখার চাইতে অনেক গুন বেশি বেড়েছে।একটি টিভি ষ্টেশনের বার ঘন্টা অনুষ্ঠান সম্প্রচারের ক্ষেত্রে যুক্ত হয়েছে শতশত মিডিয়ার দিন রাত ছব্বিশ ঘন্টা অনুষ্ঠান সম্প্রচার। এক দেড় ঘন্টা বিনোদনের স্থলে ছব্বিশ ঘন্টা বিনোদন মুলক অনুষ্ঠান উপভোগের ব্যবস্থা হয়েছে। ঘরে ঘরে টিভি দেখার সুযোগ হয়েছে।হাতের মধ্যে মেঠোফোনে দুনিয়ার খবর সংরক্ষিত আছে।ইচ্ছে হলেই দেখা যায় পড়া যায়।গুরুত্বপুর্ন তথ্য উপাত্তের জন্য কারো দ্বারস্ত হওয়ার প্রয়োজন নেই- গুগল চার্জ দিলেই পাওয়া যাচ্ছে কাংখিত তথ্য।
সভ্যতার অগ্রগতির সাথে পাল্লা দিয়ে সামাজিক কাঠামোতে পরিবর্তন আনায়নের নীতিহীনতার কারনে সর্বত্র দেখা দিচ্ছে বৈপরিত্ত। সমাজ কাংখীত অগ্রগতি লাভ করছে ঠিকই --নেমে যাচ্ছে নীতি নৈতিকতার মান।বাড়ছে মানুষের সংখ্যা,কাজের পরিধি-নামছে ধর্মীয় চেতনাবোধের সুচক।সমাজ রুপান্তরীত হচ্ছে তথ্য ও প্রযুক্তি নির্ভরতায়-ধর্মে ধারন হচ্ছে অন্ধত্ব, উগ্রতা।জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমান্তরালে এগিয়ে যাচ্ছে নারী পুরুষ-সমাজে বাড়ছে অবক্ষয়, নগ্নতা।রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন আইন-বাড়ছে হত্যা গুম,নারী নির্য্যাতন। ইত্যকার ইতিবাচক উন্নয়ন অগ্রগতির সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে নেতিবাচক কর্মের পরিধি।সর্বক্ষেত্রে বিপরীত মুখী, পশ্চাদপদতা, উগ্রতা, অসহনশীলতা, বাগাড়ম্বরতায় সমাজ ব্যবস্থায় ধীরে ধীরে নেমে আসছে অন্ধকার যুগের আদিম নেশা।
দেশের মিডিয়া সমুহ এক্ষেত্রে সমাজ পরিবর্তনের ধারাকে এগিয়ে নেয়ার জন্য যে ভুমিকা পালন করার দরকার ছিল তা পালন করতে পারছে বলে মনে হয়না। এক্ষেত্রে আমি ছোট দু'টা উদাহরন দিতে চাই।কোন নারী ধর্ষিতা হলে ছবি চাপানোর কথা ছিল ধর্ষকের -মিডিয়া ধর্ষিতার ছবিতো চাপেই বরং ধর্ষিতা কোন প্রকৃতির ছিল তাও ব্যাখ্যা করার অপপ্রয়াস চালায়।যে কোন নির্বাচনে দেখা যায় পাঁচটি কেন্দ্রে গোলমাল, মারামারি ইত্যাদি সংঘটিত হয়েছে-মিডিয়া সারা দিনরাত ঐ পাঁছটির চিত্রই দেখাতে থাকে-পঞ্চাশ কেন্দ্রে স্বাভাবিক ভোট প্রক্রিয়া সমাপ্ত হচ্ছে বা স্বাভাবিক ছিল ঘুনাক্ষরেও সেদিকে ক্যামরা যায়না। সাধারন মানুষ এই থেকে যে বার্তাটি পায় তা হচ্ছে মেয়েদের নগ্নতার কারনে মেয়েরা ধর্ষিতা হচ্ছে।ভোট জনগন নিজের পছন্দমত প্রার্থীকে দিতে পারছেনা।
সন্ত্রাস নির্ভর ভোটে স্বাভাবিকভাবে মানুষ আস্থা হারিয়ে ভোট প্রক্রিয়া থেকে দূরে সরে যাবে।এতে গনতন্ত্রের বা নির্বাচন প্রক্রিয়ার পিছনে মিডিয়া ছুরিকাঘাত করছে তা মিডিয়ার জ্ঞানে আসছেনা। মিডিয়া প্রকারান্তরে মেয়েদের ঘরের মধ্যে আবদ্ধ রাখার কাজে সাহায্য করছে তাও তাঁদের জ্ঞানে আসছেনা।
এক্ষেত্রে মিডিয়া দেশের প্রতিতযষা,জ্ঞানী, গুনী, বিশেষজ্ঞদের নিয়ে স্ব-স্ব বিষয়ের -অনুষ্ঠান সম্প্রচার করার প্রয়োজন ছিল।যে বিষয়ের উপর আদৌ কোন জ্ঞান রাখেনা সেই বিষয়ে বলতে দেয়া হয় আনাড়ি কিছু ব্যাক্তি বিশেষকে।ফলত: দেখা যায় উদ্ভট তথ্য উপাত্তের বিরক্তিকর ছড়াছড়ি।
ইদানিং রাজনৈতিক দলসমুহের সভা সমাবেশ নেই বললেই চলে।মানুষের রাজনীতি সম্পর্কে জানার আগ্রহ আমাদের দেশে আগে থেকেই সহজাত প্রবৃত্তি হিসেবে যুক্ত হয়ে আছে।তাঁর মনের আগ্রহ যেহেতু পুরন করার জন্য দলগুলি কোন ব্যবস্থা নেয়না সংগত কারনে মিডিয়ার রাজনৈতিক 'টকশোর' দিকেই তাঁর মনোযোগ।ফলে গভীররাত পয্যন্ত অপেক্ষা করে হলেও সে টক শো শুনবেই।শহরের লোকদের চাইতে গ্রামের লোকেরাই এই সমস্ত সস্তা আলোচনা শুনতে চায় বেশি।
দর্শক শ্রোতাদের এমনতর দুর্বলতার সুযোগে মিডিয়া গভীর রাতে অচেনা অজানা, অশিক্ষিত অর্ধশিক্ষিত তৃতীয় শ্রেনীর রাজনীতিবিদদের টিভি সেন্টারে হাজির করে 'সমসাময়িক রাজনীতির' উপর আলোচনার আয়োজন করে।মারমুখি আলোচনা শুনতে মানুষের অবশ্যই ভাল লাগে।ভাল লাগার মাঝে ঐ ব্যক্তিটি যে উদ্ভট,মিথ্যা, অসামঞ্জস্য তথ্য দিয়ে সরল্প্রান গ্রামের দর্শককে বিভ্রান্ত করেছে তা কি মিডিয়া কতৃপক্ষ চিন্তা করেছেন? যদি চিন্তা করে থাকেন-- টকশোর বয়সতো আর কম হয়নি-নিয়ন্ত্রন করতে পারেননি কেন?
দেশের রাজনীতির বিষয় সম্পর্কে সাধারণ মানুষই শুধু নয়, স্বয়ং রাজনীতিবিদরাও নিজেদের ভুল ত্রুটি, সবলতা ও দুর্বলতা বুঝতে পারেন, জানতে পারেন। এছাড়া জাতীয় নানা ইস্যু নিয়েও সে রকম আলোচনা-সমালোচনা হলে সরকার রাজনৈতিক দল সংশ্লিষ্ট সংস্থা সমৃদ্ধ হতে পারে। আসল কথা হচ্ছে, আমরা আসলে টকশোকে কীভাবে দেখতে চাই, শেখার জন্য, নাকি অন্য কোনো উদ্দেশ্য সাধনের জন্য?
ইলেকট্রনিক মিডিয়া অত্যন্ত শক্তিশালী গণমাধ্যম। ইচ্ছা যদি সৎ থাকে মিডিয়ার মাধ্যমে আমাদের দেশ ও সমাজের অনেক কিছুই পরিবর্তন করা সম্ভব, আমি মনে করি। এটিকে শিক্ষার সবচেয়ে সহজ মাধ্যম হিসেবেও বিবেচনা করা যায়,হওয়ার কথা ছিলও তাই। মিডিয়া শুধু বিনোদনের মাধ্যমেই নয়- জীবন সম্পর্কে সচেতন, সমাজের বৈশম্য সম্পর্কে সচেতন করার মাধ্যম হিসেবেও এর কোনো তুলনা হয় না। যেহেতু সবকয়টি টিভি চ্যানেলই বেসরকারিভাবে প্রতিষ্ঠিত সেহেতু তাঁদের আয়ের দিকেই নজর থাকবে বেশি। তাদেরকে চলতে হয় বিজ্ঞাপনের প্রাপ্ত আয়ের ওপর নির্ভর করে। সেখানে তারা অনেকটাই হয়তোবা বাঁধা অবস্থায় রয়েছে। তারপরও সবকটি টিভি চ্যানেলেই যেহেতু 'টকশো' প্রোগ্রাম প্রচারিত হচ্ছে, তাই অনুষ্ঠানগুলোকে দেশ এবং জাতি গঠনে, রাষ্ট্র-রাজনীতি এবং শিক্ষা-সংস্কৃতি সচেতন জনগোষ্ঠী গঠনে উপযোগি করে নির্মান করা প্রয়োজন। সরকারও যুগ-উপযোগি সম্প্রচার নীতিমালা করা দরকার-যাতে কোন অবস্থায় টিভি চ্যানেলগুলি অর্থ সংকটের মুখোমুখি না হয়।
দুনিয়ার অনেক দেশেই ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় টকশো প্রচারিত হচ্ছে-প্রয়োজনে তাঁদের থেকে অভিজ্ঞতা ধার নেয়া যেতে পারে। অনুষ্ঠানের মান, প্রচারের ধরন, সময়, উপস্থিত বক্তার সামাজিক মায্যদা,আলোচিত বিষয়ের উপর তার দক্ষতা আমাদের মিডিয়া বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন।
জনগনকে শুধু বিভ্রান্ত করা নয় -উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করার প্রকল্প গ্রহন করার সময় এসেছে।বস্তাপঁচা অযৌক্তিক বিতর্ক নয়-যৌক্তিক তথ্যভিত্তিক, জ্ঞান সমৃদ্ধ শিক্ষনীয় আলোচনার আয়োজন করার সময় এসেছে।
টকশোগুলোকে আরো বেশি জ্ঞানমুখী, সমাজ, শিক্ষা ও সংস্কৃতিমুখী করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেয়ার সময় এসেছে। অনুষ্ঠান পরিকল্পনায় সবশ্রেনী পেশার জনগনের প্রতি খেয়াল করা দরকার। যাতে রাজনীতিক দল, ব্যাক্তি, সমাজ, সরকার জানতে পারে, সংশোধন হতে পারে, ভুলগুলি চিহ্নিত করে--শোধরানোর রাস্তা পেতে পারে।
রাজনীতির আকাল সময়ে গনতন্ত্রকে সচল রাখতে প্রকৃত বিরুধী দলের ভুমিকায় অবতিন্ন হতে হবে মিডিয়া। সার্বক্ষনিক বস্তুনিষ্ট, তথ্য নির্ভর সংবাদ জনগনকে জানানো মিডিয়ার দায়িত্ব।আমাদের দেশের ব্যাংকের টাকা চুরি হয়- ফিলিপাইনের সাংবাদিক খবর পেলেও আমাদের চতুর সাংবাদিকেরা ঘুমে থাকে। আজগুবি খবর প্রকাশে যতটুকু বাহাদুরী দেখায় তার সামান্য মেধা বস্তুনিষ্টতায় খাটালেও দেশ এবং জনগনের অনেক বেশি কল্যান হতে পারে।
________________________________
জয়বাংলা জয়বঙ্গবন্ধু
জয়তু জাতির জনকের কন্যা
বঙ্গরত্ম শেখ হাসিনা
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন