সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান
এবারের বাংলা বর্ষবরন অন্য যেকোন বছরের বর্ষবরনের তুলনায় আলাদা গৌরবের বৈশিষ্টতায় পরিপূর্ণতা পেয়েছে।
_______________________________________
এবারের নববর্ষ কয়েকটি কারনে বিশিষ্টতা পেয়েছে। অবিভক্ত ভারতীয় উপমহাদেশে পহেলা বৈশাখ উৎযাপন নিয়ে কোন বিতর্ক ছিলনা।বিতর্কের সৃষ্টি হতে থাকে দ্বিজাতিতত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান নামক সাগরের দুই পাড়ের দুই ভূখন্ডের- ভিন্নভাষা, ভিন্ন জাতি, ভিন্ন সংস্কৃতি নিয়ে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রুটির উদ্ভবের পর থেকেই।বাঙ্গালী কবি, বাংলাভাষার কবি রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরতো পাকিস্তানের ২৩ বছরই নিষিদ্ধ ছিলেন। দ্রোহের কবি কাজী নজরুল ইসলামকে দ্বিখন্ডিত করে রাখা হয়েছিল পুরুটা সময়।
প্রথম আঘাত আসে আমাদের মাতৃভাষার উপর।সেই শুরু সাম্প্রদায়িকতার উত্থান।চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাস্প।এতদিন যারা একই ভুখন্ডে আনন্দ বেদনা, উৎসব পার্বনে একে অপরের পরিপুরক ছিল, ভাগাভাগি করে পালন করছিল, তাঁরাই হয়ে গেছে একে অপরের শত্রু। ভারত থেকে ভিটেমাটি ছেড়ে স্রোতের মত আসতে থাকে বাঙ্গালী মসুলমান,পাকিস্তান থেকে স্রোতের মত উঠতে থাকে বাঙ্গালী হিন্দুরা ভারতে। রক্তগঙ্গা বয়ে যেতে লাগল ভারতবর্ষ জুড়ে। একভাই আরেক ভাইয়ের রক্তে হুলিখেলা শুরু হল। দ্বি-জাতিতত্ব প্রকারান্তরে রুপ নিল বাঙালী হিন্দু-মসুলমানের চরম বিদ্বেসের শ্বেতপত্রে। ভাষা আন্দোলনের অসম্প্রদায়িক চেতনার সাংস্কৃতিক আন্দোলনে রোপিত হল বাঙ্গালীর মনের অজান্তে স্বাধীকারের বীজ। ক্রমেই সংস্কৃতি সেবিদের পরিচর্য্যায় সেই বীজ থেকে অংকুর উদগম হয়ে রুপান্তরীত হল মুক্তিযুদ্ধের বটবৃক্ষে।অবশেষে চুড়ান্ত আসম এক রক্তক্ষয়ী লড়াই- অশুভশক্তি সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে শুভশক্তি অসাম্প্রদায়িক চেতনায় লালিত নব-উত্থিত বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদী শক্তির । সম্পুর্ণ পয্যুদস্ত করে বিজয় চিনিয়ে আনে বাঙ্গালী ১৯৭১ ইং সালের ১৬ই ডিসেম্বর।সেই বিজয় বেশীদিন স্থায়ী হয়নি বাঙ্গালীর। মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে ১৫ই আগষ্ট ১৯৭৫ ইং সালের কালোরাতে স্ব-পরিবারে হত্যা করে লুকিয়ে থাকা সাম্প্রদায়িক শক্তির দেশী বিদেশী অনুচরের দল।
শুরু হয় প্রগতির চাকাকে পিছনের দিকে ঘুরানো।জাতির জনকের জৈষ্ঠকন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বিদেশ অবস্থানের কারনে সেইরাতে ঘাতকের হাত থেকে রক্ষা পান। বহু চড়াই উৎরাই পেরিয়ে ১৯৯৬ ইং সালে জাতির জনকের কন্যার নেতৃত্বে পুনরায় বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় ফিরে আসে অসাম্প্রয়িক শক্তির প্রতিভু বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।শুরু হয় আবার নতুন উদ্যমে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদী চেতনার শানীত রুপের বহি:প্রকাশ।
এই বছর এসে নতুন এক মাত্রা সংযোজিত হয় পহেলা বৈশাখ উৎযাপনে।ঘরে ঘরে দেখা দেয় আনন্দের বন্যা। উৎসবের আমেজ সৃষ্টি করেছে দেশজুড়ে।পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে জানা যায়- এবার পহেলা বৈশাখে ১৪শত কোটি টাকা কেনাকাটা হয়েছে, যাহা ঈদ উৎসবে দেখা যেত।
নববর্ষকে সামনে রেখে বাংলাদেশ রয়েছে উৎসব পালনের প্রস্তুতির তুঙ্গে। ঘরে-বাইরে চলছে নানা উদ্যোগ, বহুমুখী কর্মকাণ্ড। নতুন বছরের শুরুটা কিভাবে করা হবে এই চিন্তায় সবাই মতোয়ারা। ঘরবাড়ি পয়পরিষ্কার করা, কি খাওয়া হবে, নতুন কোন পোশাক কেনা হবে, কোথায় যাওয়া হবে প্রভৃতি নিয়ে ইতোমধ্যে ঘরে ঘরে পরিকল্পনা কার্যকর হয়ে যাচ্ছে, চলছে নানা আয়োজন। দোকানিরা বিশ্রামের অবকাশ পাচ্ছে না। পাড়ায়-পাড়ায়, ভবনে ভবনে, সংগঠন-প্রতিষ্ঠানগুলোতে চলছে নানামুখী আয়োজন। নতুনকে বরণ করতে গ্রাম-এলাকা-শহরগুলোতে কর্মচাঞ্চল্যের যেন জোয়ার বইছে।
জাতীয়ভাবেও চলছে মন-প্রাণ উজাড় করে দিয়ে নানা উদ্যোগ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন পাট শ্রমিকদের বকেয়া বেতন ও বৈশাখী ভাতা দেয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেন যে, "বোনাস পেয়ে সারা দেশের মানুষ আনন্দ-উৎসব করবে, "আর আমার পাট শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য পাওয়া না পেয়ে থালা-বাসন নিয়ে বসে থাকবে, এটা মানতে পারছি না।"সত্যিকারের রাষ্ট্রনায়কোচিত বক্তব্যই দিলেন সংসদে-যোগ্য পিতার যোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গরত্ম শেখ হাসিনা ।
এবারের নববর্ষ পালনের মেজাজটাই পূর্বের যে কোনো সময়ের চেয়ে আলাদা। আলাদা মাত্রা পাওয়ার কারণ হচ্ছে রাষ্ট্র-সরকার সর্বোতভাবে নববর্ষ পালনে চাকরিজীবীদের অর্থের যে জোগান দিচ্ছে, তা ছড়িয়ে পড়ে সবাইকে যেন নতুনকে বরণ করতে নতুনভাবে আন্দোলিত করে তুলছে। প্রসঙ্গত এটা তো ঠিক যে, অতীত থেকেই আমাদের সমাজে কম-বেশি কোনো না কোনোভাবে নববর্ষ পালনের রেওয়াজ ছিল। দোকান-ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানে হালখাতা, স্থানে স্থানে মেলা প্রভৃতি সব ধর্ম-বর্ণের মানুষের অংশ গ্রহণে মুখরিত হয়ে থাকত। অ-যৌক্তিক তারপরেও কিছু নিয়ম কানুন অবহমানকাল থেকে পালিত হয়ে আসছে-এই একটি দিন কাউকে বকাবকি করা যাবে না, কিছু একটা ভালো খেতে হবে, ভালো জামাকাপড় পরিধান করতে হবে,দোকানে বাকী বকেয়ার জন্য যাওয়া যাবেনা,দোকানদারও দিবেনা- প্রভৃতি কম-বেশি সব সম্প্রদায়ের মধ্যেই ছিল। দিনটি নিঃসন্দেহে বাঙালির সব ধর্ম সম্প্রদায়ের মানুষের মিলনের একটা উপলক্ষ হিসাবে অবস্থান নিয়ে ছিলই। সেটাকেই প্রধানমন্ত্রী এইবারেই প্রথম সরকারের পক্ষ থেকেসরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বোনাস উপহার দিয়ে আনন্দের জোয়ার এনে দিলেন।নি:সন্দেহে ইহা এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
আমাদের জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্যের শিকড় বহুদূর বিস্তৃত, বহু গভীরে প্রোথিত। এই ইতিহাস-ঐতিহ্য ভালো-মন্দে, জয়-পরাজয়, বেদনা ও বীরত্বপূর্ণতায় গাঁথা। মন্দের পরাজয় ও ভালোর বিজয়ে গৌরবমণ্ডিত। বার বার জাতি কলঙ্কের কালিমা মোচন করেছে-বার বার গৌরবের তিলক পরেছে। এই জাতি কখনো পশ্চাদমুখী হয়েছে, কখনও বিপথগামী হয়েছে-- কিন্তু কোনো দিন দিকভ্রষ্ট হয়নি, পরাজয় মেনে বসে থাকেনি। ত্যাগের বিনিময়ে পরাজয়কে জয়ে রুপান্তরীত করে সামনে এগিয়ে গেছে।আজকের সার্বজনীন বৈশাখী উৎসব তাই প্রমান করে।
আমাদের মনে রাখতে হবে--বাঙ্গালীর ইতিহাস-ঐতিহ্য,কৃষ্টি-সংস্কৃতি ইত্যাদি ধর্মীয় বিষয় নয়।অন্য সব জাতীর ন্যায় আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্য ধারন করা এবং পালন করায় দুষনীয় নয়।যেমন:- পোষাক পরিচ্ছেদে, খাওয়া-দাওয়া, চলা- ফেরা,কৃষ্টি-সংস্কৃতিতে প্রত্যেক জাতি গোষ্টির নিজস্বতা রয়েছে--জাতি হিসেবে আমাদের নিজস্বতা আমাদের ধরে রাখাই বাঙ্গালীর ঐতিহ্যকে ধারন করা।
তাই আসুন ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো/তাপস নিঃশ্বাস বায়ে/ মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে’ উচ্চারীত হোক প্রতিটি বাঙ্গালীর কন্ঠে।
জয়বাংলা জয়বঙ্গবন্ধু
জয়তু জাতির জনকের কন্যা
বঙ্গরত্ম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন