মহান স্বাধীনতা ও গৌরবের বিজয়-- =========≠=================== ১৯৬৯এর গনয়ান্দোলনের মুখে টিকতে না পেরে লৌহমানব খ্যাত আইয়ুব খাঁন রাতের আধাঁরে তাঁরই জাতভাই আর এক সেনা কর্মকর্তা ইয়াহিয়া খাঁনকে হাতে খমতার মসনদ দিয়ে তল্পিতল্পা নিয়ে চলে গেলেন।ইয়াহিয়া জনগনের দাবী একজন এক ভোট নীতিতে সাধারন নির্বাচনের দাবী মেনে নিলেন।মেনে না নিয়ে উপায় ছিলনা-ততোদিনে পাকিস্তানের উভয় অংশে আন্দোলন এমন এক পয্যায় গিয়ে পৌছে সেখান থেকে জংনকে ঘরে পাঠানো কোন রকমেই সম্ভব হতনা।ইয়াহিয়া নির্বাচন দিলেন কিন্তু সাথে এমন একটি অধ্যাদেশ জারী করলেন আপাত দৃষ্টে মনে সবার নিকট গ্রহন্যোগ্য না হওয়ারই মত।সামরীক সরকার ঘোষনা দিয়ে বললেন,প্রেসিডেন্ট যদি মনে করে নির্বাচিত জনপ্রতিনীধি সম্বলিত সংসদ দেশের জন্য হুমকি হতে পারে তবে প্রেসিডেন্ট তা ভেঙ্গে দিতে পারবেন।উভয় পাকিস্তানের বিজ্ঞ অভিজ্ঞ রাজনৈতিক দল ও ব্যাক্তিবর্গ এই অধ্যাদেশ প্রত্যাহার করার জোর দাবি জানালেন।অনেকেই নির্বাচন করে কোন লাভ হবে না মন্তব্য করে নির্বাচন বয়কট করার হুমকি দিয়ে রাখলেন।উল্লেখ্যযে উভয় পাকিস্তানে জনগনের নেতা হিসেবে সবাই সবাইকেই মনে করে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে হযবরল অবস্থা সৃষ্টি করে রেখেছেন।কেহ কাউকে ছাড় দিতে রাজি ছিলেন না। জনগনের আসল একক নেতা বা জনগনের পক্ষে একক সিদ্ধান্ত দেয়ার কোন নেতার আর্বিভাব ততোদিনেও হয়নি। সবাই সবাইকে জনগনের একমাত্র মুখপাত্র হিসেবে ভাবেন। মুলত তাঁদের কারোরই একচিলতে পরিমান জনসমর্থন ছিলনা।যেহেতু তাঁর আগে কোন সাধারন নির্বাচন অনুষ্টিত হয়ে সংখ্যা গরিষ্ট দলের নেতা নির্বাচিত হননি। বঙ্গবন্ধু জানতেন নির্বাচনে সংখ্যা গরিষ্টতা পেলেও পশ্চিমারা বাঙালি নেতাদের হাতে ক্ষমতা দিবেন না। খমতা হস্তান্তর না করার পরিনতি কি হতে পারে সুদুরপ্রসারী চিন্তাবীদ ততোদিনে আছঁ করতে বেগ পেতে হয়নি। বঙ্গবন্ধু এও জানতেন বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তিনি একমাত্র পুর্ব পাকিস্তানের একক সিদ্ধান্ত দেয়ার মালিক।নির্বাচনে ম্যান্ডেট ছাড়া এই জনসমর্থনের কোন মুল্যই ছিল না। এদিকে অভ্যন্তরীন রাজনীতিতে নির্বাচন না করে আন্দোলনে যাওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধুর উপর চাপ সৃষ্টি করে রাখা হল। এই চাপ আওয়ামীলীগের অভ্যন্তরে যেমন তেমনি বাহিরের অন্য বিরুধিদলের পক্ষ হতেও। বঙ্গবন্ধুর চিন্তাচেতনায় তখন একমাত্র নির্বাচন করে পুর্ববাঙলার একক সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকারি হওয়া।বিদেশি রাষ্ট্র সমুহের সাহায্যের জন্য যাহা একান্তই প্রয়োজন ছিল। প্রয়োজনে পাকিস্তানিরা নির্বাচনকে আরো কঠিন শর্তের বেড়াজালে আবদ্ধ করলেও নির্বাচন করা ঐ মহুর্তে জরুরীই ছিল। সকল চাপকে উপেক্ষা করে তিনি নির্বাচনে অংশ গ্রহন করার ঘোষনা দিয়ে মাঠে নেমে গেলেন। অভিজ্ঞ রাজনীতিক মাওলানা ভাসানি সহ আরো কিছু চীন সমর্থিত দল নির্বাচন বয়কট করে শ্লোগান উঠালেন,""ভোটের বাক্সে লাথী মার--পুর্ব বাংলা স্বাধীন কর।""এখানে যে বড় রকমের ষড়যন্ত্র বঙ্গবন্ধুর বুঝতে সামান্যতম দেরী হয়নি।পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে থেকে এই ধরনের বিচ্ছিন্নতার শ্লোগান দেয়া সত্বেও ইয়াহিয়ার সামরিক সরকার তাঁদের বিরুদ্ধে কোন রুপ আইনানূগ ব্যাবস্থা গ্রহন না করে বরঞ্চ রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতা দিয়ে যাচ্ছিল।এই থেকেই বুঝতে অসুবিধা হয়নি ভোট বর্জন করার কি কারন থাকতে পারে। বঙ্গবন্ধু চলমান আন্দোলনের অংশ হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহন ঘোষনা দিয়ে ৬দফা দাবীর সমর্থনে গনরায় চেয়ে দেশের প্রত্যান্ত অঞ্চলে সফর শুরু করে দিলেন।ভোটের ঝড়ো হাওয়ার ঘোরপাকে সকল ষড় যন্ত্র উবে গেল।পুর্ব পাকিস্তানে ১৬৯ আসনের মধ্যে ১৬৭ আসনে জীতে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ট আসন লাভ করে একমাত্র নেতা হিসেবে দেশ বিদেশের স্বীকৃতি নিয়ে নিলেন।ষড়যন্ত্রকারিদের হাতে পুর্ব পাকিস্তান বিষয়ে আর কোন সিদ্ধান্ত নেয়ার আইনগত ভিত্তি রইলোনা। সংখ্যাগরিষ্ট আসনের অধিকারি বঙ্গবন্ধুর নিকট ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যাপারে এইবার শুরু হয় আর এক নাটক। শুরু হল প্রাসাদ ষড়যন্ত্র,খমতা হস্তন্তর না করার ফন্দিফিকির,অযথা গড়িমসি। সংসদের অধিবেশন ডেকেও তা স্থগিত করে দেন ইয়াহিয়া। ষড়যন্ত্রের মঞ্চে আর্বিভুত হন জনাব ভুট্রো।তিনি কিছুতেই বঙ্গবন্ধুর হাতে খমতা দিতে রাজী নহেন।খমতার অংশিদারিত্ব দাবী করে বসেন তিনি।খমতা যাতে বঙ্গবন্ধুর হাতে না আসে তাঁর জন্য ঘোষিত অর্ডিনেন্স এর খমতা প্রয়োগ করার জন্য অনেকে প্রেসিডেন্টকে প্ররোচিত করতে থাকেন। এমনি অবস্থায় ইয়াহিয়া ঘোষিত সংসদ অধিবেষন স্থগিত করে দেন।স্থগিত ঘোষনা প্রকাশ হওয়ার সাথে সাথে পুর্ববাংলা ফুঁসে উঠে।কিছুতেই জনগন এই ঘোষনা মেনে নিতে পারেনি।জনাব ভূট্রোর পরামর্শে ইয়াহিয়া আলোচনার আহব্বান জানালেন।কৌশলি ভুট্রো--ইয়াহিয়া আলোচনার নামে সময়ক্ষেপন করে পুর্বপাকিস্তানে সৈন্য সমাবেশ ঘটাতে থাকেন। বঙ্গবন্ধুর বুঝতে অসুবিধা হয়নি, পশ্চিম পাকিস্তানিরা গায়ের জোরে আন্দোলন দমন করার কৌশল অবলম্বন করছে।গন আন্দোলন গনুভ্যুত্থানে রুপ ধারন করেছে ততোদিনে।বঙ্গবন্ধু সব দিক নেড়েচেড়ে দেখে নিলেন ঠিক আছে কিনা।জোয়ারের মত বত্রিশ নম্ভরের বাড়িতে মানুষের স্রোত আসতে শুরু করেছে।সারাদেশ মিছিলের দেশে পরিনত হয়ে গেছে।নগর বন্দর,গ্রাম গঞ্জ,সব বয়সের মানুষ মিছিলে সামিল হয়ে গগন বিদারি শ্লোগানে শ্লোগানে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে তুলছিল।স্বাধীকারের আন্দোলন রুপান্তরীত হয়ে গেল স্বাধীনতার আন্দোলনে।সারা দেশ, অফিস আদালত,বঙ্গবন্ধু যাহাই বলেন তাহাই অক্ষরে অক্ষরে পালন করে চলেছেন।পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে সকল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিল পুর্ববাংলার মানুষ।অঘোষিত সরকার প্রধান বঙ্গবন্ধু, আঙ্গুলি হেলনে দিকের নিশানা খুঁজে নিচ্ছেন পুর্ব বাংলার মানুষ। এল সময় ঘনিয়ে ৭ইমার্চের। উত্তাল বাংলার সব স্রোত তখন বঙ্গবন্ধুর বত্রিশ নম্ভর বাড়িতে।ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের উত্তাল বাংলার জনগন স্রোতেরমত সমবেত হতে থাকলেন রেসকোর্স ময়দানে।বাংলার অবিসংবধিত নেতা আজ দিক নির্দেশনা মুলক ভাষন দিবেন।দেশি বিদেশি সকল শক্তি অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছেন বাংলার নেতা এই জটিল পরিস্থিতিতে কি বলেন শুনার অপেক্ষায়।অবশেষ এলেন নেতা, ধীর স্থীর গম্ভীর বেসে।জনতা বাঁশের লাঠি আর বাদ্যযন্ত্রের আমোঘ সুরমুর্চনায় নেতাকে সম্ভাষন জানালেন।নেতা দুই হাত উদ্ধে তুলে বিশাল বুকের সব ভালবাসা বিলিয়ে দিলেন জনতার উদ্দেশ্যে।সেই এক অন্যরকম দৃশ্যের অবতারনা করলো নিমিশে সভাস্থল।ভাবগম্ভীর দরাজ গলায় বঙ্গবন্ধু ভাষন দিলেন জাতির উদ্দেশ্যে। এইতো ভাষন নয়,স্বল্প সময়ে পাঠ করলেন বিশাল এক মহাকাব্য।"তুলনাহীন ভাষার মাধুর্য্য,অতুলনীয় ভাষার ব্যাবহার, বজ্রকঠিন আওয়াজ, এমনতর ভাষন বঙ্গবন্ধুর সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে আর একটাও কোন স্থানে কোন সময়ে দিয়েছিলেন-- এই তথ্য আজও পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশের কোন অঞ্চলের ভাষায় তিনি সর্বগ্রায্য, সর্বজনবোধ্য ভাষনটি দিয়েছেন তাও গভেষনা করে বের করতে হবে।প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি চয়ন, প্রতিটি বাক্য বিশ্নেষনে পাওয়া যায়-- মহা এক কাব্যের অমোঘ শব্দের গাঁথুনি। যুগযুগ গভেষনা করেও শেষ করা যাবেনা এই ভাষনের তাৎপয্য। তিনি সেদিন ঘোষনা করলেন,"এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম--এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম"।তিনি আরো বললেন তোমাদের যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থেকো, আমি যদি হুকুম দেবার না-ও পারি, তোমরা সংগ্রাম চালিয়ে যাবে।"এই দেশকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ। সাথে সাথে শর্ত সাপেক্ষে তিনি আলোচনার দরজাও খোলা রাখলেন।ততদিনে দেশের বিভিন্নস্থানে অগনিত মানুষ পাকিস্তানিদের গুলিতে মৃত্যু হয়েছে,বঙ্গবন্ধু বললেন, "রক্তের উপর পা দিয়ে আমি আলোচনায় বসতে পারিনা।যাদেরকে হত্যা করা হয়েছে তাঁদের তদন্ত পুর্বক ব্যাবস্থা গ্রহন করতে হবে,আগে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে,তার পর বিবেচনা করে দেখবো আলোচনায় বসা যায় কিনা।"" গত কয়েক মাস আগে জাতিসংঘ যুগশ্রেষ্ঠ ভাষন হিসেবে ৭ই মার্চের ভাষনকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। জয়বাঙলা জয়বঙ্গবন্ধু জয়তু দেশরত্ম শেখ হাসিনা।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার রয়েছে গৌরবময় এক ইতিহাস।বিশ্বের খুব কম সংখ্যক জাতির রয়েছে এই গৌরব গাঁথা।কোন জাতি এত রক্ত এত মা বোনের ইজ্জত বিলীন করে স্বাধীনতা লাভ করতে হয়নি।

মন্তব্যসমূহ